যে কলম সবার কান্না মোছে, তার নিজের রক্তক্ষরণ দেখবে কে?
যে কলম সবার কান্না মোছে, তার নিজের রক্তক্ষরণ দেখবে কে?
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৪ মে ২০২৬
— একটি পেশার অন্তরালের গল্প
সমাজ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন তারা জেগে থাকেন। যখন সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন, তখন তারা ধেয়ে যান বিপদের মুখে— ক্যামেরার লেন্স আর একটা কলম সম্বল করে। হ্যাঁ, তারা সাংবাদিক। সমাজের দর্পণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। কিন্তু এই দর্পণের পেছনে যে কতশত ফাটল, কতশত বুকফাটা আর্তনাদ লুকিয়ে থাকে, তা কি আমরা কখনো দেখার চেষ্টা করেছি?
আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, দেশের বুকে সাংবাদিকতা পেশাটি আজ এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। বাইরে থেকে যে পেশাকে জমকালো বা প্রভাবশালী মনে হয়, তার ভেতরের ক্যানভাসটা শুধুই অবহেলা, অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনার কালিতে আঁকা।
"মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যে মানুষটি নিজের জীবন বাজি রাখেন, দিনশেষে নিজের পরিবারকে ডাল-ভাত খাওয়ানোর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও তার থাকে না।"
একটি জাতীয় দৈনিকের পাতা খুললে বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে আমরা প্রতিনিয়ত বুনো সত্যের মুখোমুখি হই। কিন্তু সেই সত্যটা যিনি তুলে আনছেন, তার ঘরের খবর আমরা ক’জন রাখি? মাসের পর মাস বকেয়া বেতন, ছাঁটাইয়ের খড়্গ, আর চাকরি হারানোর প্রতিনিয়ত আতঙ্ক— এই হলো আজ অধিকাংশ গণমাধ্যমকর্মীর নির্মম বাস্তবতা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে যখন একজন সাংবাদিক নিজের সন্তানের মুখে এক চামচ দুধ তুলে দিতে হিমশিম খান, কিংবা টাকার অভাবে অসুস্থ মা-বাবার ওষুধ কিনতে পারেন না, তখন তার কলম সচল থাকলেও হৃদয়টা কিন্তু ঠিকই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
শুধু কি অর্থনৈতিক টানাপোড়েন? এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবননাশের অবিরাম হুমকি। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেড়াজাল, কখনো করপোরেট হাঙ্গরদের রক্তচক্ষু, আবার কখনো বা সরাসরি সশরীরে হামলার শিকার হতে হয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সাংবাদিকদের তালিকাটা কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই পেশাকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একটা সময় পরিবারগুলো গর্ব করে বলতো, "আমার সন্তান সাংবাদিক।" আর আজ? সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে মায়ের বুক।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সাংবাদিকরা সবার অধিকার নিয়ে সোচ্চার হন, সবার বঞ্চনার কথা পত্রিকার পাতায় লিড নিউজ করেন; কিন্তু যখন নিজেদের অধিকারের কথা আসে, তখন তারা বড্ড একলা, বড্ড অসহায়। তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা।
একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। কিন্তু চাবুকের মুখে রেখে আর পেটে ক্ষুধা নিয়ে কখনো স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। যদি এই রাষ্ট্রের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তবে সবার আগে বিবেকের কারিগরদের বাঁচাতে হবে। ওয়েজবোর্ড বা বেতন কাঠামোর সঠিক বাস্তবায়ন, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুরক্ষার বিষয়টি আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।
আমরা আর কোনো সাংবাদিকের শূন্য পকেট আর ভেজা চোখ দেখতে চাই না। আমরা চাই না সত্যের সন্ধানে গিয়ে কোনো বুক খালি হোক। এই সমাজ আর রাষ্ট্রের কাছে একটাই আকুল আবেদন— যে কলমটি সবার কান্না মোছার দায়িত্ব নিয়েছে, তাকে অন্তত নিজের রক্তক্ষরণে বিলীন হয়ে যেতে দেবেন না।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা