বেড়েছে পাটের আবাদ, ভালো ফলনেও দুশ্চিন্তা

শার্শার মাঠে সোনালি আঁশের জোয়ার, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৫ পিএম ২১ বার পঠিত
শার্শার মাঠে সোনালি আঁশের জোয়ার, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
ছবি: সংবাদ ২৪ ঘন্টা

শার্শার মাঠে সোনালি আঁশের জোয়ার, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৭ সেপ্টে ২০২৬
মনির হোসেন বেনাপোল প্রতিনিধি ### বছর কয়েক আগেও যে জমিতে অন্য ফসলের চাষ হতো, এবার সেসব জমির অনেকটাই দখল করেছে পাট। সবুজ পাটগাছ এখন শার্শার মাঠজুড়ে। কোথাও পাট কাটা হচ্ছে, কোথাও চলছে আঁটি বাঁধার কাজ। আবার কোথাও কৃষকেরা পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের সম্ভাবনায় এ বছর পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। তবে উৎপাদন খরচ বাড়ায় বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। শার্শা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চল পাট চাষের উপযোগী দো-আঁশ মাটি, মান ভালো, অনুকূল পরিবেশে রোগ বালাই কম, কৃষকদের প্রতি কৃষি বিভাগের উদ্বুদ্ধকরণ ও নিয়োমিত পরামর্শ, কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকির বিনামূল্যে বীজ প্রদানসহ অল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এ বছর ৫০৩ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের চাষ করা হয়েছে। গত মৌসুমে এ আবাদ ছিল ৫ হাজার হেক্টর, অর্থাৎ এক বছরে পাটের আবাদ বেড়েছে ৫০৩ হেক্টর। উপজেলার দো-আঁশ মাটি পাট চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ বছর আবহাওয়াও পাটের অনুকূলে ছিল। ফলে অনেক এলাকায় পাটের গাছ হয়েছে বেশ ভালো। কৃষকদের আশা, বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৬ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যেতে পারে। চাষকৃত পাট জাতের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় কৃষি সেবাইন জাতের পাট বীজ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেশি ও উচ্চফলনশীল জাতের পাট চাষ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে বীজ পাওয়ায় অনেক কৃষক পাট চাষে আগ্রহী হয়েছেন। পাশাপাশি পাট ও পাটখড়ির বাজারে চাহিদা থাকায় এ ফসলকে লাভজনক মনে করছেন তারা। তবে ভালো ফলনের পরও কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে উৎপাদন খরচ নিয়ে। পাট কাটা, আঁটি বাঁধা ও জাগ দেওয়ার জন্য শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। বেড়েছে জ্বালানি ও পরিবহন খরচও। ফলে বাজারে প্রত্যাশিত দাম না মিললে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। কৃষকেরা বলছেন, শুধু আবাদ ও উৎপাদন বাড়লেই হবে না, উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা পাট চাষে আরও উৎসাহিত হবেন। শার্শার মাঠে এখন পাট কাটার ব্যস্ততা। কৃষকের ঘরে উঠছে সোনালি আঁশ। সেই সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা পরিশ্রমের ফসলের ন্যায্য দামও ঘরে ফিরবে। পাটের আবাদ বাড়ার এই ধারাকে টেকসই করতে বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এখন কৃষকদের সবচেয়ে বড় দাবি। কৃষকরা বলছে, জন, মুজুরী, সার, তেলের দাম বেশী, আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে ফসল উৎপাদন করি। ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেলে আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বো। সরকারের কাছে একটাই দাবী আমরা চাষীরা যেন ফসলের ন্যায্য মূল্য পাই, সরকার যেন কৃষকদের দিকে নজর দেয়। শার্শার বাগআঁচড়া এলাকার পাটচাষি আবদুল হালিম বলেন, পাটের ফলন এবার ভালো হয়েছে। কিন্তু পাট কাটতে ও জাগ দিতে শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। তেলের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। বাজারে ভালো দাম না পেলে কৃষকের লাভ থাকবে না। পাট চাষে পরিশ্রম অনেক। ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত একের পর এক খরচ করতে হয়। তাই বাজারে দাম কমে গেলে কৃষকের সব পরিশ্রম বৃথা যাবে। আরেক পাটচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে পাট চাষ করি। ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত অনেক খরচ হয়। বীজ বোনা থেকে শুরু করে পাট জাগ দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কাজে খরচ বেড়েছে। পাটের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে পাটসহ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক।’ স্থানীয় ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন জানান, মৌসুমের শুরুতে বাজারে পাটের সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সময় কৃষকেরা অনেক ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে পাট বিক্রি করেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও প্রকৃত উৎপাদক কৃষকেরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন। পাটের পাশাপাশি পাটখড়ি থেকেও বাড়তি আয় হয়। জ্বালানি, ঘরের বেড়া, ছাউনি এবং বিভিন্ন কাজে পাটখড়ির ব্যবহার থাকায় স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও পাটখড়ি পাঠানো হয়। ফলে পাটের বাজারদর কিছুটা কম হলেও পাটখড়ি বিক্রি করে কৃষকেরা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।’ তবে পাটের দাম স্থিতিশীল না থাকলে সামগ্রিকভাবে চাষিদের লাভবান হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন তারা। এদিকে পাটের সঙ্গে পাটখড়ি থেকেও বাড়তি আয়ের সুযোগ রয়েছে কৃষকদের। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাটখড়ির চাহিদা থাকায় পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষকদের মতে, পাটের বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে এ ফসল তাদের জন্য আরও লাভজনক হয়ে উঠবে। শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, চলতি মৌসুমে সরকারি প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের মধ্যে পাটের বীজ বিতরণ করা হয়েছে। পাট উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাট কাটার পর সঠিক পদ্ধতিতে জাগ দেওয়া হলে আঁশের মান ভালো হবে এবং কৃষকেরা বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাট জাগ দেওয়ার সময় পরিষ্কার পানি ব্যবহার, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর পর ভালোভাবে ধুয়ে শুকানোর বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মানসম্মত আঁশ উৎপাদন করতে পারলে বাজারে এর চাহিদা ও দাম দুটিই ভালো থাকবে।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।